কতটা ভয়ের করোনা! আতঙ্ক না ছড়িয়ে সতর্ক হন, কী কী করবেন আর করবেন না জানালেন বিশেষজ্ঞ

সঞ্জীব আচার্য, কর্ণধার, সিরাম অ্যানালিসিস: বিশ্বজোড়া মহামারী নোভেল করোনাভাইরাস (2019-nCov)। চিনের উহান শহর থেকে যে ভাইরাস ছড়িয়েছে তা এখন গোটা বিশ্বেই মহামারীর চেহারা নিয়েছে। চিনের বাইরে এই সংক্রমণ ছড়াচ্ছে মারাত্মকভাবে। সংক্রামিত দু’লক্ষ ছুঁতে চলেছে। মৃতের সংখ্যা অন্তত আট হাজার। ভারতেও বাড়ছে ভাইরাস আক্রান্তের সংখ্যা। এই ভাইরাসের উৎস এখনও অজানা। বাদুর ও প্যাঙ্গোলিন থেকে এই সংক্রমণ ছড়িয়েচে বলে মনে করা হলেও নিশ্চিত তথ্য এখনও কিছু নেই। মানুষের থেকে মানুষে এই ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়াচ্ছে সবচেয়ে বেশি।

নোভেল করোনাভাইরাস আসলে কী?

করোনাভাইরাস আসলে একটা ভাইরাস নয়। এর বিরাট পরিবার আছে। আলফা, বিটা, ডেল্টা ও গামা—এই চার করোনাভাইরাসের পরিবারের আবার নানাভাগ রয়েছে। বিটাকরোনাভাইরাসের বিশেষ একটা ভাইরাল স্ট্রেনই মহামারী হয়েছে বিশ্বে। এই স্ট্রেনকে বলা হচ্ছে নতুন (নোভেল)করোনাভাইরাস। এর নাম সার্স-সিওভি-২ (SARS-COV-2)। এই ভাইরাল স্ট্রেনের সংক্রমণকে বলা হচ্ছে সিওভিডি ১৯ (COVD 19)। মানুষের শরীরে সংক্রমণ ছড়ায় এমন করোনাভাইরাস অনেক রয়েছে যাদের বলে হিউম্যান-করোনাভাইরাস (HCoV) । এরা সবাই কিন্তু মহামারী ছড়ায় না। শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ, সর্দি-কাশি-জ্বরের জন্য দায়ী ওইসব হিউম্যান-করোনারা। তবে ব্যতিক্রম এই সার্স-সিওভি-২। কীভাবে মানুষের শরীরে এত তাড়াতাড়ি ছড়িয়ে পড়ছে এই ভাইরাস সেটা এখনও অজানা। মানুষের থেকে মানুষেই সংক্রমণ হচ্ছে সবচেয়ে বেশি।

কীভাবে ছড়াচ্ছে সিওভিডি-১৯?

এই ভাইরাস কীভাবে ছড়াচ্ছে সেটাই বড় প্রশ্ন। যে কোনও ভাইরাসেরই এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় বাহিত হওয়ার জন্য একটা আধার দরকার হয়। যাকে অবলম্বন করেই এরা ছড়িয়ে পড়তে পারে অথবা এক শরীর থেকে অন্য শরীরে বাসা বাঁধতে পারে। এই আধার হচ্ছে এয়ার ড্রপলেট, কাঠ, প্লাস্টিক বা এমনই কোনও অজৈব বস্তু। বাতাসে কয়েক ঘণ্টা বেঁচে থাকতে পারে এই ভাইরাল স্ট্রেন। কখনও একদিনের বেশিও বাঁচতে পারে। ‘এয়ার ড্রপলেট’-এর মাধ্যমে এদের ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা বেশি। আরও একটা মাধ্যম আছে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার সেটা হল ‘রেসপিরেটারি ড্রপলেট’। হাঁচি, কাশি বা থুতু-লালার মাধ্যমে এক শরীর থেকে অন্য শরীরে সংক্রমণ ছড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে। তাই কোনও বড় জমায়েত, অধিক মানুষের সংস্পর্শ এই সময় এড়িয়ে চলাই উচিত। কারও শরীরে সামান্য উপসর্গ দেখা গেলেই তার থেকে অন্তত ছ’ফুট দূরত্ব বজায় রাখা দরকার। অনেক সময় দেখা যায় এই ভাইরাসের সংক্রমণে প্রাথমিকভাবে উপসর্গ ধরা পড়ে না (asymptomatic)। ফলে সেইসব মানুষের সংস্পর্শে থাকলে সংক্রামিত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। তাই সতর্ক এবং সচেতন থাকাটা খুবই জরুরি। সামান্য উপসর্গ দেখা দিলেও সঙ্গে সঙ্গে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো এবং নিজেকে কোয়ারেন্টাইনে রাখা দরকার।

মানুষের থেকে মানুষে দ্রুত ছড়াচ্ছে করোনার সংক্রমণ

শ্বাস-প্রশ্বাস, থুতু, লালা এবং বাতাসে বাহিত হয়ে খুব দ্রুত মানুষের থেকে মানুষে ছড়িয়ে পড়ছে ভাইরাসের সংক্রমণ। একজন সংক্রামিতের থেকে কম করেও দু’জন আক্রান্ত হচ্ছেন ভাইরাসে। দেখা গেছে, কোনও ব্যক্তি বা মহিলা ভাইরাসের সংক্রমণের শিকার হলে যদি নিজেকে সঙ্গে সঙ্গে কোয়ারেন্টাইন করে না ফেলেন, তাহলে তাঁর সংস্পর্শে যতজন আসবেন তাঁরাও সংক্রামিত হবেন। গোটা বিশ্বে এভাবেই মহামারী হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস। আক্রান্তদের সংস্পর্শ থেকেই আরও অনেকের মধ্যে ছড়িয়ে যাচ্ছে সিওভিডি ১৯।

গুজব থেকে সাবধান

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ে বাজারে অনেক রকম গুজব রটছে। কীভাবে ছড়াচ্ছে ভাইরাস সেই নিয়ে অনেক ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে মানুষের মনে। দেখে নেওয়া যাক কী কী ভুল ধারণা রয়েছে এই ভাইরাস নিয়ে—

• বাতাসে ছড়াচ্ছে করোনা। আসলে বাতাল নয় এয়ার ড্রপলেট বা রেসপিরেটারি ড্রপলেট-হাঁচি,কাশি, থুতু, লালা থেকে ছড়াচ্ছে এই ভাইরাসের সংক্রমণ।
• মল থেকে ছড়াচ্ছে ভাইরাস এটাও ঠিক নয়। সিওভিডি ১৯ সংক্রামিত ব্যক্তির মল থেকে ভাইরাস ছড়াতে পারে এমন সম্ভাবনা কম। অনেক সময়েই মলে ভাইরাসের উপস্থিতি দেখা যায় তবে তার থেকে ব্যাপক হারে সংক্রমণ ছড়ানোর আশঙ্কা কম।
• পশুর থেকে ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়াচ্ছে এমন খবর রটলেও তার সত্যতা এখনও প্রমাণিত হয়নি। তবে খোলা বাজারে সতর্ক হয়েই চলা উচিত। বিশেষত কাঁচা মাংস বা আনাজপাতি ধরলে স্যানিটাইজার দিয়ে হাত ধুয়ে ফেলা উচিত। রান্নার সময় মাছ-মাংস ধুতে হবে সাবধানে। ভাল করে ফুটিয়ে রান্না করে খেলে যে কোনও সংক্রমণের ভয়ই থাকে না।
• পোষ্যের থেকে সিওভিডি ১৯ সংক্রমণের তেমন সম্ভাবনা এখনই দেখা যায়নি।
• অ্যান্টিবায়োটিক ভাইরাসের সংক্রমণ কমাতে পারে না। তাই অ্যান্টিবায়োটিক কেলেই সিওভিডি ১৯ সেরে যাবে এমন খবর ভিত্তিহীন।

করোনা থেকে কীভাবে সুরক্ষিত রাখবেন নিজেকে?

নোভেল করোনার সংক্রমণ থেকে বাঁচতে সবরকমের সতর্কতা অবলম্বন করা দরকার। আক্রান্ত হওয়া থেকে বাঁচতে কী কী করণীয় দেখে নেওয়া যাক এক ঝলকে—

• বারে বারে সাবান বা জল দিয়ে ভাল করে হাত ধোওয়া উচিত। অন্তত ২০ সেকেন্ড ধরে হাত কচলে ধুতে হবে। ভাল হয় যদি এমন হ্যান্ড-স্যানিটাইজার ব্যবহার করা যায় যাতে ৬০ শতাংশ অ্যালকোহল রয়েছে।
• হাত না ধুয়ে চোখে, মুখে, নাকে ও কানে হাত দেওয়া উচিত হবে না। যে কোনও সারফেসে থাকা ভাইরাস এইভাবেই শরীরে প্রবেশ করতে পারে।
• সর্দি-হাঁচি-কাশি বা জ্বর এমন উপসর্গ দেখা দিয়েছে সেইসব মানুষের সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকাই ভাল। কারও শরীরে সংক্রমণ দেখা দিলে তার ধারেকাছে না যাওয়াই ভাল।
• নিজের মধ্যে কোনও রকম উপসর্গ দেখা গেলে বা অসুস্থ হলে বাড়িতে থাকাই ভাল। স্বেচ্ছায় কোয়ারেন্টাইনে গেলে বাকিদের মধ্যেও সচেতনতা বাড়বে।
• হাঁচি বা কাশি আটকাতে টিস্যু ব্যবহার করা একান্ত দরকার। তারপর সেই টিস্যু এদিক ওদিকে না ছড়িয়ে ফেলে দিতে ডাস্টবিনে।
• সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোলের নির্দেশিকা মেনে ফেস-মাস্ক ব্যবহার করা উচিত।
• ফেস মাস্ক সংক্রমণের ভয় অনেক কমিয়ে দেবে। বিশেষত যাঁরা পাবলিক ট্রান্সপোর্টে যাতায়াত করেন এবং হাসপাতাল-নার্সিহোমের ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীরা যাঁরা রোগীদের সংস্পর্শের থেকে চিকিৎসা করছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে ফেস-মাস্ক বিশেষভাবে দরকার।

কী কী উপসর্গ দেখলেই সতর্ক হতে হবে

করোনাভাইরাসের সংক্রমণে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে ফুসফুস। সর্দি-কাশি-গলা-ব্যথা, জ্বর দিয়ে উপসর্গ শুরু হয়ে শেষে অঙ্গ বিকল এবং সংক্রমণ চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছলে মৃত্যু ঘটতে পারে। ভাইরাস আক্রান্ত হওয়ার ২-১৪ দিনের মধ্যে উপসর্গ দেখা দিতে পারে। অনেক সময়েই উপসর্গ সামান্য হয়, সেক্ষেত্রেও সতর্ক হওয়া উচিত।
যে সব উপসর্গ দেখে নিজে সাবধান হবেন— ঘন ঘন হাঁচি, কাশি, গলা ব্যথা, জ্বর-শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া, তীব্র শ্বাসকষ্ট।
এই ভাইরাসের ইনকিউবেশন পিরিয়ড ১৪ দিনের মতো। কম করে পাঁচ দিন। তার মধ্যে উপসর্গ দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো উচিত। ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটেছে কিনা জানতে তিন রাউন্ডের ল্যাবোরেটরি টেস্ট করা হয়।

কীভাবে সারবে সিওভিডি ১৯

করোনাভাইরাসের কোনও ড্রাগ বা ভ্যাকসিন এখনও বাজারে আসেনি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইজরায়েল, চিন, হংকং, অস্ট্রেলিয়া, এমনকি ভারতেও এই ভাইরাস-প্রতিরোধী ভ্যাকসিন তৈরির চেষ্টা চলছে। আমেরিকায় প্রথম এক মহিলার উপর ভ্যাকসিনের প্রয়োগ হয়েছে, তবে সেই ভ্যাকসিন বাজারে আসতে এখনও দেরি। বিজ্ঞানীরা বলেছেন, দ্বিতীয় পর্যায়ে ট্রায়াল শুরু হয়েছে। জানা গেছে, রাজস্থানে এইচআইভি, সোয়াইন ফ্লু ও ম্যালারিয়ার ড্রাগের ককটেলে সংক্রমণ সারাবার চেষ্টা করছেন ডাক্তাররা। রোগী নাকি সেই চিকিৎসায় সাড়াও দিয়েছে। তবে সেই পদ্ধতি কতটা উপযোগী সেটা এখনও নিশ্চিত করে বলেননি ডাক্তাররা।

তবে করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন যবেই আসুক না কেন, সবচেয়ে আগে দরকার সার্বিক স্তরে সচেতনতা। আতঙ্ক আর গুজব না ছড়িয়ে সতর্ক হওয়া বেশি দরকার। তাহলেই রোখা যাবে সংক্রমণকে।

Total Page Visits: 371 - Today Page Visits: 1

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Shares